October 3, 2022

স্বামী উড়িয়েছিলেন জাতীয় পতাকা, সেই থেকে হতভাগা এই বৃদ্ধা। বাংলার আকাশে লাল সবুজের পতাকা তোলার অপরাধে চোখের সামনে শত্রুদের বুলেট কেড়ে নিয়েছে স্বামী, দুই সন্তানসহ পরিবারের পাঁচজনের প্রাণ। দুই পায়ে বুলেটের আঘাত নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের হতভাগা রেজিয়া বেওয়া।

দেশ-স্বাধীন হয়েছে, পদ্মা-মেঘনায় কত জল গড়িয়েছে, ক্ষমতার বদল হয়েছে বহুবার। তবে খোঁজ রাখেনি কেউ, ভাগ্যে জোটেনি শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি। শরীরজুড়ে রোগ শোক নিয়ে ধুকছেন বৃদ্ধা রেজিয়া বেওয়া।

তিনি জানান, দেশের পতাকা উত্তোলন করাই ছিল তার স্বামীর অপরাধ। একাত্তরের উত্তাল মার্চ। পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে দিনাজপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন তার স্বামী আফসার আলী। একাত্তরের ২৬ মার্চ দিনাজপুর তিনি পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও পুলিশ কোয়ার্টারে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা উত্তল করেন। দুই দিন পর ২৮ মার্চ তার উপর হামলা পড়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের।

জোহরের নামাজের জন্য অজু করার সময় নির্বিচারে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আফসার আলী। তার সাড়ে চার বছরের শিশুপুত্র আব্দুর রাজ্জাক বাবু, আড়াই বছরের শিশুকন্যা আরেফা খাতুনকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। বাদ পড়েননি আফছার আলীর বোন বেলী খাতুন ও তার স্বামী পুলিশ লাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তবিবর রহমান। আফসার আলীর দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রেজিয়াও দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ হন।

একসঙ্গে স্বামী-সন্তানসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হারিয়ে তার পরিবারে নেমে আসে চরম দুর্দাশা। দেবর আব্দুস সাত্তারের সহযোগিতায় দিনাজপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও দুই মেয়েকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন রেজিয়া। বড় মেয়ে আফরোজা ও মেজো মেয়ে আকতারিকে নিয়ে এপ্রিলের মাঝামাঝি অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান অন্তঃসত্ত্বা রেজিয়া। পায়ে হেঁটে ছুটতে থাকেন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। যখন যেখানে রাত হয়, তখন সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েন। পায়ে হেটে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে, গরুর গাড়িতে সীমান্ত পার হন তারা।

দিনরাত ছোট ছোট মেয়েদের হাত ধরে হাটতে হাটতে ক্লান্ত শরীরগুলো পৌঁছায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। সেখানে জন্ম নেয় ছোট মেয়ে পারভীন। তার জন্মের ৪০ দিন পর দেশ স্বাধীন হলে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের শালমারা ইউনিয়নের বারো পাইকা গ্রামে স্বামী আফসারের বাড়িতে চলে আসেন তিনি। শুরু হয় বেঁচে থাকার সংগ্রাম। মাত্র তিন বিঘা জমি ছাড়া কিছু নেই। চাষাবাদ করে যা আসে তাই দিয়ে নিজেদের ভরণপোষণ আর সন্তানদের লেখাপড়া।

পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ফুফাতো ভাই আফসারের ঘরে বউ হয়ে আসেন রেজিয়া। কল্পনাও করেননি তার জীবনে এমন অন্ধকার নেমে আসবে। দাঁতের উপর দাঁত চেপে অর্ধাহারে, অনাহারে থেকে মেয়েদের নামে স্বামীর লিখে দেওয়া জমিটুকু বিক্রি করে বড় মেয়ে আফরোজাকে বিয়ে দেন বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার খান পাড়ায়। একই উপজেলার রানীরপাড়ায় বিয়ে হয় মেজো মেয়ে আকতারি বেগমের, আর ছিচার পাড়ায় বিয়ে দেন সবার ছোট পারভীন আক্তারকে।

এখন ৫-৬ শতক জমি আর টিনশেডের একটি ঘর ছাড়া আর কিছু নেই তার। পাঁচ বছর ধরে তার গলায় ব্লাডের পাথর, ভাল্ব নষ্ট। টাকা-পয়সার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও মুখ তুলে তাকায়নি। দেশ স্বাধীনের পর বেশ কয়েক বছর সরকারি কোনো সুযোগ সুবিধাই পাননি তিনি। ১৯৮৫ সাল থেকে ২২শত’ টাকা করে পেনশন পেতে শুরু করেন। এখন পেনশন হিসেবে যে ছয় হাজার একশ টাকা পান, তা দিয়েই মাস কাটাতে হয় রেজিয়ার।

বড় মেয়ের জামাই নুরুল হোসেন কাজী জানান, দেশের জন্য একসঙ্গে একই পরিবারের পাঁচটি তাজা প্রাণ ঝড়ে গেছে, এরপর দেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু শহীদ পরিবারের মর্যাদাটুকুও পাননি তারা। গুলি করে হত্যার পর স্বামী, সন্তান ও স্বজনদের লাশ পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখতে পারেননি রেজিয়া বেওয়া। একটি গর্তে মাটি চাপা দেওয়া হয় তাদের। সেই কষ্টে এখনো ঘুমোতে পারেন না রেজিয়া। মনে হলেই চোখের জলে বুক ভেসে যায় তার।

রেজিয়া বেওয়া তার চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়েছেন সরকারের কাছে। সুস্থ হয়ে তিনি একাত্তরের নরঘাতকদের সীমাহীন অত্যাচারের গল্প ছড়িয়ে দিতে চান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ হোসেন জানান, তার যদি সরকারী লাল তালিকায় গেজেট ভুক্ত নাম উঠে থাকে, সেক্ষেত্রে করা সম্ভব। অন্যথায় সম্ভব না।

মিনহাজুল/বার্তাবাজার/এ.আর

Leave a Reply

Your email address will not be published.