‘সরকার আমাগো গ্যাস বৈধ করে দিলেই পারে!’

‘সরকার আমাগো গ্যাস বৈধ করে দিলেই পারে? তাইলে তো আর বার বার আপনাগো আসা লাগে না’- পঞ্চান্ন বছরের বৃদ্ধা ফরিদা বেগম এই প্রতিবেদককে এমনটা জানান। মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) বিকালে সাভার উপজেলার আশুলিয়া ইউনিয়নের কাঠগড়া পালোয়ান পাড়া মোড় এলাকায় নিজের চায়ের দোকানে বসে অবৈধ গ্যাস সংযোগ গ্রহনের বিষয়ে আলাপচারিতার একপর্যায়ে তিনি সরকারের কাছে এমন আবেদন জানান।

নিজের বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালান তিনি। বাড়ির দুইটি রুম ভাড়াও দিয়েছেন। ভাড়াটিয়ারা গার্মেন্টস কর্মী। এই এলাকার অন্য আরও বাসাবাড়িতে নেওয়া অবৈধ গ্যাস সংযোগ গ্রহনকারীর মতো তার বাসায়ও ছিলো অবৈধ সংযোগ। কারা তাকে এই সংযোগ প্রদান করেছে এবং কেনো এই অবৈধ সংযোগ নিয়েছেন এব্যাপারে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, তারা বাড়ির মালিক; কিন্তু সরকার তাদেরকে বৈধ ভাবে গ্যাস না দেওয়ায় অবৈধ সংযোগ বাধ্য হয়ে নিতে হচ্ছে তাদেরকে। গ্যাস না থাকলে ভাড়াটিয়ারা থাকে না। একই এলাকায় যেখানে গ্যাস সংযোগ আছে হোক না সেটা অবৈধ, ভাড়াটিয়ারা সেখানেই চলে যায়। তাহলে এত টাকা খরচ করে বাড়ি বানানোর পর গ্যাস না থাকার কারণে তাদের বাড়ি খালি পড়ে থাকে। তাই সরকারের কাছে বৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদানের দাবী জানান এই সিনিয়র সিটিজেন।

কাঠগড়া পালোয়ান পাড়া মোড় এলাকার ‘জারিফ ভিলা’ নামের একতলা টিনশেড ভবনের মালিক মোঃ জাকির হোসাইন। নিজের এই টিনশেড ভবনটি ভাড়া দিয়ে তিনি পরিবার নিয়ে অন্যত্র থাকেন। মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) তিতাস কর্তৃপক্ষের অভিযানে তার এই বাড়িতে নেওয়া অবৈধ সংযোগটিও কাটা পড়ে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে জানান, শিল্পাঞ্চল হবার কারণে সাভার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের বসবাস। আর আমরা বাড়ি বানানোর ফলেই তারা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে এখানে থেকে চাকরি করে। সেই ২০১৫ সালের পর থেকে সরকার নতুন করে আর আবাসিক সংযোগ প্রদান করছে না। আমরা বাড়িওয়ালারা অনেকেই ‘ডিমান্ড নোট’ দিয়ে আবেদন করে বসে আছি।

গ্যাস না পাওয়ার কারণেই এভাবে অবৈধ সংযোগ নিচ্ছি আমরা। তিতাসের অভিযানে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও যেভাবেই হোক আবারও নতুন ভাবে অবৈধ সংযোগ প্রদান অব্যাহত রয়েছে। সেই গ্যাস তো অপচয় হচ্ছেই, তাহলে সরকার যদি অন্তত শিল্পাঞ্চল এলাকার বাসাবাড়িগুলোতে বৈধ গ্যাস সংযোগ প্রদান করে, তাহলে তো আর সমস্যা থাকে না। সরকারের রাজস্ব ও বাড়ে, পাশাপাশি শ্রমিক ও বাড়িওয়ালারাও ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে। এখন অবস্থাটা এমন, অভিযান চলাকালীন বাড়িওয়ালারা যেন চোর বা ডাকাত। আপনারা সাংবাদিকেরা এবং অন্যরা তো সেভাবেই আমাদেরকে ‘ট্রিট’ করেন। আপনাদের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাই, আমাদের এই অঞ্চলের বাসাবাড়িতে যেন বৈধ সংযোগ প্রদান করা হয়।

কাঠগড়া পালোয়ান পাড়া এলাকার আরও অনেক বাড়িওয়ালারা নিজেদের নাম প্রকাশ না করে এভাবেই তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক বাড়িওয়ালা জানান, যারা অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয় তারা প্রভাবশালী, তাদেরকে তো কেউ কিছু করতে পারে না। এদের প্রভাবের কারণেও অনেক ক্ষেত্রে আমাদেরকে অবৈধ সংযোগ নিতে হয়। আগে এদেরকে আইনের আওতায় আনুন। আর এ পর্যন্ত তিতাসের করা মামলায় কতজনের গ্যাস আইনে শাস্তি হয়েছে? সেরকম দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ঘটনা দু’একটি থাকলেও এই অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেওয়ার হার কমে যাবে। বাড়িওয়ালারা তো চোর না, তারাও এই দেশের নাগরিক। তাদের কথাও ভাবতে হবে সরকারকে। আমাদেরকে বৈধ গ্যাস সংযোগ দিন।

মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড এর সাভার জোনাল বিপনন অফিস এই এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ অভিযান পরিচালনা করে। সাভার জোনাল বিপনন অফিসের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আবু সাদাত মোঃ সায়েম এর নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। পরিচালিত অভিযানে প্রায় এক কিলোমিটার ব্যাপী অবৈধ পাইপলাইন তুলে ফেলা সহ অবৈধ রাইজারগুলো জব্দ করা হয়।

এব্যাপারে প্রকৌশলী আবু সাদাৎ মোহাম্মদ সায়েম জানান, আজ (মঙ্গলবার) আশুলিয়া থানাধীন পালোয়ান পাড়া মোড় এলাকায় পরিচালিত অভিযানে আনুমানিক এক কিলোমিটার এলাকার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এতে প্রায় পাঁচশত বাসাবাড়িতে নেওয়া অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। তিতাসের মূল লাইন থেকে অবৈধভাবে একটি অসাধু চক্র এসব সংযোগ প্রদান করেছে যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা এসব অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন সহ অবৈধ পাইপলাইন ও রাইজার জব্দ করেছি। যারা এই অবৈধ সংযোগ প্রদান করেছে আমরা তাদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছি। এদেরকে চিহ্নিত করে বাংলাদেশ গ্যাস আইন ২০১০ অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবো। এধরণের অভিযান চলমান থাকবে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, আশুলিয়া রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আনোয়ার হোসেন অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ অভিযান চলাকালে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেন। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিলো।

অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকালে এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন- তিতাস গ্যাস টি এন্ড ডি কোম্পানি লিমিটেড এর সাভার জোনাল বিপনন অফিসের উপ-ব্যবস্থাপক মোঃ আনিসুজ্জামান রুবেল প্রমুখ সহ তিতাসের কারিগরি টিমের সদস্যগণ।

অভিযান চলাকালে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর জন্য আশুলিয়া থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

মামুন/বার্তাবাজার/এম.এম

ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published.