মানিকগঞ্জে নিয়ম না মেনে দেয়া হচ্ছে ইটভাটার ছাড়পত্র

মানিকগঞ্জে পরিবেশ আইনে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইট ভাটার ছাড়পত্র দেয়ার অভিযোগ উঠেছে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নূর আলমের বিরুদ্ধে। বছরের পর বছর পরিবেশের কর্মকর্তারা এ জেলায় বদলী হয়ে এলেও এর কোন সুরাহ করতে পারেনি কোন কর্মকর্তা। তাছাড়া ভাটার মালিকরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ার কারনে এলজিইডি, সওজয়ের পাকা সড়ক ও বসত-বাড়ীর আশে পাশে কৃষি জমিতে অপরিকল্পিতভাবে প্রায় অর্ধশতাধিক ইটভাটা গড়ে তোলে।

ইটভাটার ধোঁয়ায় কয়লা থেকে ভীষণ ক্ষতিকর কার্বন মনোক্সাইড নির্গত হয়। ভাটার বিষাক্ত কালো ধোয়ায় মানুষের সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় এবং গাছ, ফলমূল ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলেও চোখ, কান বন্ধ করে বসে আছে দায়িত্বরত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা।

মানিকগঞ্জ সদর, সিঙ্গাইর, হরিরামপুর ও ঘিওর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেলার অধিকাংশ কৃষি জমি বিলীন হয়ে গেছে। ইটভাটায় মাটি বিক্রির ফলে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার পুকুর। প্রতিদিন বিভিন্ন সড়কে শত শত ট্রাকে কৃষি জমির মাটি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। ফলে এসব এলাকার বাতাসে ধুলার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে জেলায় ইটভাটা রয়েছে ১৫১টি। এর মধ্যে ১১৭টির পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে। বাকি ৩৪ টিকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। পরিবেশের ছাড়পত্র না নেয়ায় সম্প্রতি আমিন, স্বাধীন ও সততা ব্রিক্স এ পরিবেশের অভিযান করলেও এখনো ইট পোড়ানোর কার্যক্রম চলমান। প্রতিটি ইটভাটা গড়ে উঠেছে গড়ে প্রায় ৪০ বিঘা ফসলী জমির উপর। প্রত্যেক বছর প্রতি ভাটায় ইট তৈরি হয় প্রায় ১ কোটির মতো। এই ইটভাটায় ইট তৈরী করতে ব্যবহার করা হচ্ছে ফসলী জমির মাটি। এসব ইটভাটার কারনে একদিকে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ অন্যদিকে ক্ষতি হচ্ছে ফসলী জমি।

পরিবেশ আইনে আছে, ইটভাটার ছাড়পত্র পেতে হলে ভাটার অবস্থান হতে হবে লোকালয় ও এলজিইডির পাকা সড়ক থেকে ন্যুনতম আধা কিলোমিটার দূরে। প্রস্তাবিত জায়গাটি আবাদি কি না সে ব্যাপারে কৃষি বিভাগের প্রত্যয়নপত্র, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং প্রশাসনের অনাপত্তি, ট্রেড লাইসেন্স, আনুষঙ্গিক কাগজপত্রসহ আবেদনপত্র করতে হবে। এরপর সেগুলো সরেজমিনে তদন্ত করে শর্ত সাপেক্ষে পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করবে সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু জেলার পরিবেশের দায়িত্বরত কর্মকর্তা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ছাড়পত্র দিচ্ছে এসব ইটভাটার।

জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ জানায়, ইটভাটার আশপাশের মানুষ হাঁচি দিলে নাক দিয়ে কয়লার মতো কালো পদার্থ বের হয়। আবাদি বা ফসলী জমির পাশে ইটের ভাটা গড়ে ওঠায় ভাটার নিঃসৃত ধোঁয়া পার্শ্ববর্তী জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়। শীতকালীন সবজি লাউ, টমেটো, মুলা এবং চলমান মৌসুমের সবজি নষ্ট হয়ে যায়। জমিতে অন্যান্য ফসলও আশানুরুপ ফলন পাওয়া যায় না। এছাড়াও ইটভাটা সংলগ্ন এলাকাগুলোর আম, কাঁঠাল,পেয়ারা ও কলা সহ বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছে ফল ধরা বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রায় অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে।

বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারি বিমল রায় বলেন, শুধুমাত্র অবৈধ্য ইটভাটাগুলোতে জরিমানা করলে পরিবেশ দূষন রোধ হবে না। যেসকল ভাটা বৈধ্য কাগজপত্র থাকার পরেও নিয়ম না মেনে পরিবেশ দূষন করে তাদেরকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। রাতের আঁধারে যারা কৃষি জমির মাটি কেটে নিচ্ছে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনতে হবে।

পরিবেশবাদীরা বলেন, আইনের তোয়াক্কা না করে যখন ইটভাটার অনুমোদন দেওয়া হয় তখন আস্তে আস্তে ওই এলাকায় ইটভাটা বাড়তে থাকে এবং কৃষি জমি কমতে থাকে। অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে জেলার আবাদী জমি, বনভুমি ও পরিবেশকে মারাত্মক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন। কৃষি নির্ভর দেশে আবাদী জমি ও বনভূমি উজাড় এবং পরিবেশ দুষণের কবলে পড়ে জেলার অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য এসব ভাটায় আইনী অভিযান জোড়দার করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারন খামার বাড়ি মানিকগঞ্জের উপ-পরিচালক আবু মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ্ বলেন, মানিকগঞ্জে ইটভাটা করা যাবে এমন কোন ভাটামালিককে কোন ছাড়পত্র বা প্রত্যায়ন পত্র দেয়া হয় নাই। কারন যেখানে ইটভাটা গড়ে উঠে সেখানে ভাটার মালিকরা ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে ডোবায় পরিনত করে। ফলে ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। বিভিন্ন মিটিংয়ে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেও এর কোন প্রতিকার পাচ্ছি না।

মানিকগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নূর আলম বলেন, আমি নিয়ম মেনেই ইটভাটার ছাড়পত্র দিয়েছি।

জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ বলেন, নিয়ম মেনেই ইটভাটায় ছাড়পত্র দেয়া হয়। যদি কোন ইটভাটায় নিয়ম না মেনে ছাড়পত্র দেয়া হয় তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং হাইকোর্টের আদেশ হাতে পাওয়ার পর অবৈধভাবে গড়ে উঠা ইটভাটাগুলোকে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়া হবে।

সজল/বার্তাবাজার/এম আই

Leave a Reply

Your email address will not be published.