বড় লোক হওয়ার আশায় কিডনি বিক্রি, টাকা যায় দালালদের পকেটে

এক যুগেও বন্ধ করা যায়নি কিডনি ব্যবসা। জয়পুরহাটের কালাইয়ের ৪০টি গ্রামের অসহায়, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বড় লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে প্রলুব্ধ করা হচ্ছে কিডনি বিক্রি করতে। এতে অনেকে লোভে পড়ে সে পথে পা বাড়াচ্ছেন। বিক্রি করছেন কিডনি। কিন্তু যে আশায় কিডনি বিক্রি করছেন তা পূরণ হচ্ছে না। যে পরিমাণ অর্থ পাওয়ার কথা তা দেওয়া হচ্ছে না এদের কাউকেই। সবাই নামমাত্র মূল্যে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পাচ্ছেন। যদিও আইনে কিডনি বিক্রি বন্ধ। তবে পরিবারের কারো কিডনি প্রয়োজন হলে শুধু রক্তের সম্পর্কের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তা দান করতে পারবেন, এক্ষেত্রে অর্থের কোনো বিষয় নেই।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা কিডনি বিক্রি করছেন তাদের অনেকেই স্বাস্থ্যের বিষয়ে ফলোআপ করেন না। ফলে শারীরিক নানা জটিলতায় তাদের অনেকেই মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছেন। আবার কাঙ্ক্ষিত অর্থ না পেয়ে নিজেই কিডনি বিক্রির দালাল বনে যাচ্ছেন। নেমে পড়ছেন কিডনি ব্যবসায়।

এদিকে এই কিডনি বিক্রির চক্র এখন ঢাকাসহ অনেক স্থানেই সক্রিয়। দালালদের খপ্পরে পড়ে এরা পার্শ্ববর্তী দেশে কিডনি বিক্রির জন্য পাড়ি জমায়। স্থানীয় প্রশাসনের যথাযথ নজরদারির অভাবে এই চক্র সক্রিয়। তাদের রোধ করা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে র্যাব কিডনি বিক্রির সঙ্গে জড়িত দালালদের কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছে।

র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ইত্তেফাককে বলেন, দালালদের অনেককেই ধরা হয়েছে। তারা জড়িতদের নাম বলেছে। আমরা এই দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে। যে কোনো মূল্যে এই কিডনি বিক্রি বন্ধ করতে হবে।

রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল বাতেন বলেন, কিডনি বিক্রি নিয়ে কেউ সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পুলিশ সর্বোচ্চ তত্পরতায় রয়েছে। জড়িতদের পেলেইে গ্রেফতার করা হবে। জয়পুরহাটের পুলিশ সুপার মাসুম আহমেদ ভূইয়া বলেন, বিষয়টি আমরা মনিটর করছি।

জয়পুরহাটের কালাইয়ের বহুতি গ্রামে বাস করেন মোশারফ হোসেন। ২০১১ সালে ৪ লাখ টাকায় চুক্তিতে নিজের কিডনি বিক্রি করেন। পান ২ লাখ টাকা। বাকি টাকা আর পাননি। নিজের কিডনি বিক্রি করে টাকা না পেয়ে ক্ষোভে তখন থেকে তিনি দালালদের খাতায় নাম ওঠান। গত সাত বছর তিনি কিডনি বেচাকেনা দালাল হিসেবে কাজ করেন। সে সময় ঢাকায় বসে যারা কিডনি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন তাদের মধ্যে তারেক আযম ওরুফে বাবুল চৌধুরীর এবং সাইফুল ইসলামের হয়ে কাজ করতেন।

বয়স বাড়ার কারণে তার পরিবর্তে ঐ স্থানে তার নিজের ছেলে মো. জহুরুল ইসলামকে যুক্ত করেছেন। মোশারফ যাদের হয়ে কাজ করতেন ছেলে জহুরুল তাদের হয়ে কাজ না করে ঢাকার নতুন আরেক কিডনি বেচাকেনার মহাজন রাইহান হোসেনের হয়ে কাজ করছেন। বর্তমানে তার ব্যবসা চলমান আছে। তাদের মতো প্রতিদিন নতুন কিডনি বিক্রেতা এবং দালাল সৃষ্টি হচ্ছে এই এলাকায়।

জহুরুলের মতো অল্প সময়ে যারা কিডনি বেচাকেনার নতুন দালাল হিসেবে বনে গেছেন তারা হলেন—উপজেলার বিনইল গ্রামের মো. কাওছার, বাগইল গ্রামের জুয়েল, কুসুমসারা গ্রামের আশরাফ আলী, দুর্গাপুর গ্রামের ছাইদুর রহমান, নয়াপাড়া গ্রামের নুরনবী, বাগইল গ্রামের ইমরান হোসেন, তালোড়া বাইগুনি গ্রামের আলামিনসহ অনেকেই। এদের অধিকাংশই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট শহরে রিকশাচালকের কাজ করেন। মূলত তারা কিডনি বিক্রির কাজে দালালির কাজ করেন। এই মহামারি করোনাকালীন সময়ও থেমে ছিল না ওদের কিডনি বেচাকেনার কারবার। প্রতিনিয়ত এ উপজেলার অভাবী মানুষদের দেহের মূল্যবান কিডনি বিক্রিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন এসব দালাল।

কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের ভেরেন্ডি গ্রামের কিডনি বিক্রেতা নুরুল ইসলামের ছেলে আকতার আলম (৩৯) কিডনি বিক্রি করেন। ৪ লাখ টাকার মধ্যে পান দেড় লাখ টাকা।

এছাড়া স্থানীয় দালালের খপ্পরে পড়ে উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের শিমরাইল গ্রামের মো. আবেদ রহমান (৪২), তেলিহার গ্রামের মুক্তি বেগম (৩২), বিনইল গ্রামের মো. কাওছার ও বাগইল গ্রামের জুয়েল, দুলাল হোসেন (৪৪), বোড়াই গ্রামের জোসনা বেগম (৩৫), দুধাইল গ্রামের সুজাউল মন্ডল নামে এক ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে ভারতে গিয়ে তিনি কিডনি বিক্রি করেন। চুক্তিমতো কিডনি বিক্রির টাকা পাননি। যা পেয়েছেন তার পরিমাণ খুবই অল্প। টাকা চাইতে গেলে দালালরা অনেককে ভয়ভীতি, প্রাণনাশ ও গুম করার হুমকি দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.