October 6, 2022

দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় দারিদ্রতা, অনগ্রসরতা, ভৌগলিক প্রতিবন্ধকতা ও করোনাকালীন সময়ে ক্ষতিগ্রস্থ্য হওয়া পরিবারের দারিদ্র বিমোচনে অন্যান্য পেশার পাশাপাশি সমসাময়িক কালে আইসক্রিম বিক্রির পেশা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এ পেশায় ব্যাপক হারে বেড়েছে শিশু শ্রম।

যাদের হাতে থাকার কথা বই খাতা কলম কিন্তু তাদের হাতে রয়েছে আইসক্রিমের ঘন্টি। রোজ সকালে সাইকেলের পিছনে বাক্সভর্তি আইসক্রিম নিয়ে বের হয়ে পড়ে গ্রামের প্রতিটি বাজার, মাদ্রাসা, স্কুল সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামনে। ঘন্টি আর বাঁশি বাজিয়ে শিশুদের আকৃষ্ট করতে চলে তাদের অভিনব চেষ্টা। কেউ আবার গলা হাকিয়ে “ওই আইসক্রিম বলে ডাকতে থাকে। কেউ আবার সাইকেলের সামনে মাইক লাগিয়ে বাজাচ্ছে আইসক্রিমের রেকডিং প্রচার সহ আগের দিনের জারি ও আঞ্চলিক গান।

টিফিনের ফাঁকে এবং স্কুল ছুটির পর ছেলে মেয়েরা এসব শব্দ শুনে দৌড়ে আসে আইসক্রিম বিক্রেতার কাছে। তপ্ত রোদে লাল, সাদা, নীল, হলুদ, বেগুনী সহ রং বেরঙের আইস্ক্রিম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে দ্বীপের শত শত শিশু। কথা হয় ছবিতে আইক্রিম বিক্রেতা ছেলেটির সাথে। নাম মো: তারেক (১০)। সে উপজেলার নলচিরা ইউনিয়ন ৯নং ওয়ার্ডের হেলাল উদ্দিনের ছেলে।

তারেক জানায়, পরিবারে চার ভাই বোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। এক বোন বড় বাকি দুই বোন তার ছোট। সে পাশের একটি বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়তো। করোনাকালীন সময়ে স্কুল বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু হলেও সে এখন আর স্কুলে যায় না। এলাকার অন্যান্য ছেলেদের সাথে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করতো। বর্তমানে আইসক্রিম বিক্রি করে প্রতিদিন ১৫০-২০০ টাকা উপার্জন করে। সেখান থেকে সাইকেল ভাড়া দিতে হয় ৫০ টাকা। বাকি টাকা দিয়ে তার পরিবারের দৈনন্দিন খরচের সহায়তা করে।

তারেক আরো জানায়, অনেক দিন হলো তার বাবা দেনার দায়ে এলাকা ছেড়ে চট্টগ্রামে চলে যায়। সেখানে রিক্সা চালায়, পরিবারের কোন খোঁজ খবর নেয় না, সংসার চালাতে তার মাকে অনেক অমানবিক কষ্ট করতে হয় বলে সে দৈনন্দিন খোরাকীর জন্য আইসক্রিম বিক্রি করছে।

ভারাক্রান্ত কন্ঠে তারেক বলেন, “রৌদ্রের মধ্যে সাইকেল চালিয়ে কষ্ট করে আইসক্রিম বিক্রি করি, আমার বয়সী সবাই স্কুল মাদ্রাসায় যায়, আমিও চাই সবার মত স্কুলে যেতে, ওদের মত পড়ালেখা করতে।

কথা হয় উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের গুল্যাখালী গ্রামের মিলাদ উদ্দিনের (১২) সঙ্গে, সে জানায় ৩ বছর আগে তার বাবা মারা গিয়েছে, পরিবারে মা ছোট বোন সহ তিন জনের সংসার, বড় ভাই বিয়ে করে বৌ নিয়ে চলে গেছে। মা ভিক্ষা করে, তাই সে পড়া লেখা বাদ দিয়ে উপার্জন করে মাকে সংসার চালাতে সাহায্য করে, সারাদিন আইসক্রিম বিক্রি করে ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তা দিয়ে কোন রকম চলে সংসার।

তারেক, মিলাদ, অন্তর রাশেদ, সম্পদ সহ অনেক শিশু করোনা মহামারীর কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় চায়ের দোকান, মুদি দোকান, আইসক্রিম বিক্রি সহ বিভিন্ন পেশায় ঝুঁকে পড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু হলেও পরিবারের অভাব অনটন থাকায় তারা পড়াশুনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

হাতিয়ায় ছোট বড় প্রায় ২০টি আইসক্রিম ফ্যাক্টরি রয়েছে, প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে ১০-১৫ জন করে দুই শতাধিক শিশু আইসক্রিম বিক্রি করে। যাদের সবার বয়স ১০-১২ বছর। তাদের মধ্যে একজন অভিযোগ করেন, স্কুল বন্ধ থাকায় সে পাশের বাড়ির একজনের সাথে কয়েকদিন আইসক্রিম বিক্রি করেছে, এখন আর আইসক্রিম বিক্রি করতে অনিচ্ছুক। কিন্তু ফ্যাক্টরির মালিক পক্ষ থেকে তাকে জোরপূর্বক বাধ্য করছে।

অভিযোগের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ফ্যাক্টরির মালিক বলেন, আমরা প্রতিদিন হকারের চাহিদা অনুযায়ী মাল উৎপাদন করি, কিন্তু হঠাৎ করে যদি কোন হকার না আসে তখন তার মাল গুলো রয়ে যায় এবং এগুলো নষ্ট হয়ে যায়, তাছাড়া আইসক্রিমে তেমন লাভ থাকেনা, যদি কেউ আসতে না চায় যেন আগের দিন বলে দেয়, আমরা কখনো কাউকে বাধ্য করি না।

এবিষয়ে বাবা-মা আইসক্রিম ফ্যাক্টরির মালিক আহসান উল্লাহ বলেন, আমার এখানে ১২ জন শিশু শ্রমিক কাজ করে, যারা পরিবারের অভাব অনটনের কারণে এ পেশায় এসেছে। যাদেরকে নিষেধ করার পরেও কাজে চলে আসে। পরে তাদের পরিবারের অনুরোধে তাদেরকে মাল দেই। এদের মধ্যে যদি কেউ স্কুল বা মাদ্রাসায় যেতে আগ্রহী হয় আমি তাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।

এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো: মোছলেহ উদ্দিন জানান, করোনা মহামারীর কারণে দীর্ঘদিন পর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যে সকল শিশু এখনো বিদ্যালয়ে আসছেনা সে সকল শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আমাদের শিক্ষকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিবাবকদের সাথে কথা বলতেছে। শিশু শিক্ষা ঝরে পড়া রোধে শিক্ষকদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি সহ সমাজের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: সেলিম হোসেন বলেন, শিশু শ্রম বন্ধ সহ এমন ঝরে পড়া শিশু শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি। গরীব, অসহায় পরিবারে সরকারি ভাবে বিভিন্ন ভাতা প্রদান করা হচ্ছে, তাদের পরিবারে যদি কেউ ভাতার উপযোগী থাকে তাদেরকে ভাতার আওতায় আনা হবে।

রাসেল/বার্তাবাজার/এম আই

Leave a Reply

Your email address will not be published.