October 2, 2022

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করেছে দেশটির বিরোধী জোট। বিরোধীদের এমন পদক্ষেপ সফল হলে পাকিস্তানি রাজনীতি একটি অশুভ মোড় নিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। এ ছাড়া ইমরান খানের বিরুদ্ধে তারই দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের সাংসদদের একাংশ অবস্থান নিয়েছে বলেও শোনা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে উত্তেজনাকর এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশটির রাজনীতি।

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের বিরোধী জোট যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে মোটামুটি স্পষ্ট যে তারা ক্ষমতাসীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য জাতীয় পরিষদে যথেষ্ট ভোট সংগ্রহ করেছে। মূলত ঊর্ধ্বমুখী মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার জন্যই ইমরানকে দায়ী করছেন বিরোধীরা। যদিও বারবারই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন পাক প্রধানমন্ত্রী।

নিশ্চিত করে বলা যায়, দেশটিতে সৃষ্ট এ পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক জুয়া। কিন্তু ক্ষমতাসীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ জোটকে নিয়ে মতপার্থক্যও এখন প্রবল। তবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো নির্বাচিত সরকারকে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে অপসারণের নজির নেই।

এমন জটিল এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধীদের মধ্যে রাজনীতির খেলা চলছে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই। আর অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে ভোট গ্রহণের আগে এই অনিশ্চয়তা থাকবে আরও প্রায় দুই সপ্তাহ। এ ছাড়া পাকিস্তানের দীর্ঘ অনিশ্চয়তার রাজনীতির ইতিহাস বিবেচনায় নিলে, ইমরান খানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন।

পাকিস্তানের দুই প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (এন) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি সরকারের বিরুদ্ধে হাত মেলানোয় গত কয়েক মাসে দেশটির রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অন্যদিকে, সামরিক নেতৃত্ব সরকার থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে-এই ধারণা আরও উৎসাহিত করেছে বিরোধীদের।

প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়াতে অনাস্থা ভোটের আগে ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রার পরিকল্পনা করেছে বিরোধীরা, যা পরিবেশকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন পাকিস্তানের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। আর সেই অস্থিতিশীল পরিবেশ থেকে পাকিস্তান সরকার উত্তাপ অনুভব করছে, জোটের অংশীদারদের খুশি করতে ইমরান খানের নানা পদক্ষেপে তা স্পষ্ট।

কিন্তু দলের মধ্যে বড় ধরনের বিভক্তিই এখন ক্ষমতাসীনদের মাথা ব্যথার অন্যতম কারণ। এ ছাড়াও ভিন্নমতাবলম্বীদের ক্রমবর্ধমান পদমর্যাদা প্রধানমন্ত্রীর দুর্দশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সর্বশেষ বিদ্রোহ দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেরই ইঙ্গিত দেয় যা ইমরান খান সরকারের টিকে থাকাকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

ফলে সরকার বিরোধী জোট যেমন চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত, তেমনি শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জনসাধারণের কাছে ছুটে যাওয়ার সিদ্ধান্তও পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে ইমরান খানের একটি মরিয়া পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে। কিন্তু চলমান সংকট সমাধানে এই পদক্ষেপ ফলপ্রসূ না হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে।

বিভিন্ন জনসভায় পাক প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বক্তৃতাও বলে দেয় যে তিনি চাপের মধ্যে আছেন। জনপ্রিয়তাই তার দুর্বলতাকে আরও বেশি উন্মোচিত করেছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, শুধু বিরোধী দলের নেতারাই ইমরানের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু নন। দ্বৈত নীতির জন্য প্রকাশ্যে পশ্চিমা দেশগুলোরও সমালোচনা করেছেন তিনি। যেকোনো সরকার প্রধানের পক্ষে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশে একটি সংবেদনশীল বৈদেশিক নীতির বিষয়ে এমন মন্তব্য করা বিরল।

অতীতেও ইমরান খানের দায়িত্বজ্ঞানহীন অনেক বক্তব্য অন্য দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে পশ্চিমা দেশগুলোকে নিয়ে তার সাম্প্রতিক মন্তব্য ছিল সবচেয়ে অনুপযুক্ত। কারণ, এ ধরনের মন্তব্য জটিল বৈদেশিক এবং নিরাপত্তা নীতির বিষয়ে তার জ্ঞানের অভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।

যদিও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের মতে, এমন মন্তব্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তার সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশি ষড়যন্ত্রের তত্ত্বকে শক্তিশালী করার জন্য একটি ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপ হতে পারে। কারণ, সংকটের সময় জাতীয়তাবাদী অনুভূতি নিয়ে খেলা পপুলিস্ট রাজনীতির অন্যতম চরিত্র। কিন্তু পাকিস্তানের রাজনীতি এখন এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে যেখানে ছলচাতুরী কাজ করার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

নিঃসন্দেহে এটি পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুতর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। প্রকৃতপক্ষে, বিরোধী জোটের চ্যালেঞ্জের চেয়েও অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলই এই সরকারের জন্য একটি বড় সমস্যা। সম্প্রতি দলের ভেতরে বিদ্রোহ দমন করার জন্য ইমরান খান পাঞ্জাবে তার দলের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী উসমান বুজদারকে পদ থেকে সরিয়ে দেবেন বলেও শোনা গেছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো পাঞ্জাবে অন্য কোনো প্রার্থীর বিষয়ে ঐকমত্য না থাকা। পারভেজ এলাহী ছাড়া অন্য কাউকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেবে না পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কিউ)। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ সরকারের মাথার ওপর যখন অনাস্থা প্রস্তাব ঝুলছে, ঠিক তখনই নিজেদের পক্ষে বাজি ধরেছে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কিউ)। তবে ইমরান খান তার দেশের অন্যতম গুরুত্ব এই প্রদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী পদটি জোটের শরিকদের হাতে তুলে দেবেন এমন সম্ভাবনা কম। ফলে ক্ষমতাসীন জোটে বিভেদ এত গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে জোড়াতালির কোনো কৌশলে এর সমাধান করা কঠিন।

পাঞ্জাবে সরকার পরিবর্তনের পরোক্ষ একটি প্রভাব অনিবার্যভাবে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপরেও পড়বে। জনমত সংগঠিত করতে ইমরান খানের ‘জ্বালাময়ী’ বক্তব্য চলমান সংকটের পথ পরিবর্তনে সহায়ক হবে-এমন সম্ভাবনা নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদেরা।

এটা স্পষ্ট যে সরকার নিয়ন্ত্রণ করা সত্ত্বেও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ এরই মধ্যে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রদেশ পাঞ্জাবে তার রাজনৈতিক অবস্থান হারিয়েছে। সুতরাং, পাঞ্জাবে দলটির ভেতরের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ দেখে এখন অবাক হওয়ার কিছু নেই। তাই পাঞ্জাবের সংকট সমাধান না করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পক্ষে ভোটে বিরোধীদের অনাস্থা প্রস্তাবকে হারানো বেশ কঠিনই হবে।

এদিকে বিরোধীদের দাবি, পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের অনেক সাংসদ পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (এন) থেকে টিকিটের আশ্বাস পেলে দল বদলেও আগ্রহী। কিন্তু ক্ষমতার এই দোলাচলের মধ্যেও সরকারি দলে থাকা ভিন্নমতাবলম্বীদের আনুগত্য কেনা বিরোধী জোটের পক্ষে খুব সহজ হবে না। অন্যদিকে, পরবর্তীতে কী ঘটবে তা বহুলাংশে নির্ভর করবে দেশটির সামরিক বাহিনী রাজনীতির এই খেলায় কতটা নিরপেক্ষ থাকবে তার ওপর।

অনাস্থা ভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করতে যাচ্ছে পাকিস্তানের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ। তবে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ সরকারের পতন হলেও এর মধ্য দিয়ে দেশটির বিরাজমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাবে কি না, সেই অনিশ্চয়তাও পুরোপুরি কাটছে না। কারণ, অনাস্থা প্রস্তাব সফল হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে তা নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। আর বিরোধী জোট পরাজিত হলে আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারে ইমরান খানের সরকার।

বার্তাবাজার/জে আই

Leave a Reply

Your email address will not be published.