October 2, 2022

এসএসসি ও এইচএসসি দুটি পরীক্ষাতেই জিপিএ ৫ পাওয়া নাজিয়া ইসলাম সেতু (১৯) লেখাপড়া করতে চাওয়ায় পাঁচ মাসের শিশু সন্তানসহ ডিভোর্স দিল তার স্বামী। তাছাড়া সেতুর শশুর ফরিদ মিয়া কাজীর নামেও মিথ্যা মামলা করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

সেতু ও তার পরিবার জানায়, নারায়ণপুর সরাফত উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি তে জিপিএ ৫ পাওয়ার পর নরসিংদী মডেল কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ ৫ পায় সেতু।সে যখন ইউনিভার্সিটি ভর্তির জন্য কোচিং করছিল তখন লেখাপড়া বন্ধ করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিয়ের প্রস্তাব আসে। রায়পুরা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মাহমুদাবাদ গ্রামের মো. ফরিদ মিয়া তার একমাত্র ছেলে শাহজালাল আহম্মেদ রাসেলের জন্য সেতুকে পছন্দ করে। পারিবারিকভাবে ২০২১ সালের ১৫ জানুয়ারী তাদের বিয়ে হয় বেলাব উপজেলার সররাবাদ গ্রামের গোলাম মোস্তাফার বড় মেয়ে সেতুর। তিন সন্তানের মধ্যে সেতু পরিবারের বড়।

ভুক্তভোগী সেতু জানায়, বিয়ে পর ভালোই চলছিল। কিন্তু বাচ্চা গর্ভে আসার পর থেকেই তার শশুর শাশুড়ী বাচ্চা নষ্ট করার জন্য চাপ দিচ্ছিল। স্বামী রাসেল প্রথমে বাবা হওয়ার খবর শুনে খুশি হলেও পরে সেও তার বাবা মায়ের ইচ্ছা অনুযায়ী গর্ভের সন্তান নষ্ট করে ফেলার কথা বলে। সব বাঁধা পেরিয়ে ছেলে সন্তান পৃথিবীতে আসার পর লেখাপড়া বন্ধ করার জন্য স্বামী ও শশুর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। চলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। স্বামী নতুন ব্যবসা করবে বলে দশ লক্ষ টাকা যৌতুক দাবী করে। এবং লেখাপড়া বন্ধ করতে হবে বলে শর্ত দেয় স্বামী ও শশুর। এমনটাই অভিযোগ করেন সেতু ও তার পরিবার। এব্যাপারে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে সেতু।

সেতু জানায়, পরিবারের আদরের সন্তান ছিলাম। হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছি তাই সাংসারিক কাজ কম জানি। কিন্তু আমার শশুর চাই সব কাজ যেন আমি একা করি। আমার সিজারের মাধ্যমে ছেলে সন্তান জন্ম হয়। সিজারের চতুর্থ দিন স্বামী থাপ্পড় দিলে মাটিতে পড়ে যায়। ফলে সেলাইয়ের জায়গায় ইনফেকশন হয়ে শরীরে জ্বর হয়। তবুও ২০ তম দিন জোড় করে আমাকে বাবার বাড়ি থেকে শশুর বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। সংসারের সকল কাজ করতে দেয়। একদিন ছেলেকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য আধঘন্টা সময় ব্যয় করেছিলাম বলে আমার শশুর বুকের দুধ খাওয়াতে দিত না। বলে এত সময় দুধ খাওয়ালে কাজ করব কখন? তারপর বাজারের প্যাকেট দুধ খাওয়ানো শুরু করি। ফিটার বানিয়ে দিলে শশুর দুধ খাওয়ায় আর আমাকে কাজ করতে দেন। বাচ্চা কান্না করলে যদি শশুরের কোল থেকে আনতে যায় তখন ধমক দিয়ে বলে আমি নাকি বেয়াদব।

সারাদিন কাজ করার জন্য ছেলেকে আমার কোলে দিত না। একমাত্র রাতের বেলায় ছেলেকে কাছে পেতাম। শত কাজ করেও কোথাও একটু ভুল হলে শশুর শাশুড়ী গালাগালি করে।দুই দিন রাত আটটার সময় আমাকে দিয়ে কাজ হয় না, ডিভোর্স দিয়ে দিবে বলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে চেয়েছে। সন্তানের দিকে তাকিয়ে তাদের অত্যাচার সহ্য করে এসেছি। সর্বশেষ আমার স্বামী ব্যবসা করবে বলে ১০ লক্ষ টাকা চায় আমার কাছে। না দিতে পারায় আমাকে শশুরের আদেশে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু আমি ভাবিনি গোপনে সে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে। তিনদিন আগে জানতে পারি নোটারির মাধ্যমে গত ৯ ফেব্রুয়ারী আমার স্বামী আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে।আমি আমার সন্তানের পরিচয় চায়। আমি স্বামীর সংসার করতে চায়।

এ ব্যাপারে সেতুর শশুর ফরিদ মিয়া জানান, আমার ছেলের সাথে সেতুর বনিবনা হতো না। প্রায়ই নাকি আমার ছেলের গায়ে তুলেছে সেতু। তাছাড়া সে কিছু বিষয়ে আমার সাথে বেয়াদবি করত। আমার ছেলের ইচ্ছাতেই ডিভোর্স দেওয়া হয়েছে। পূনরায় ছেলের বৌকে ফিরিয়ে আনবেন কিনা জানতে চাইলে ফরিদ মিয়া বলেন সেটা তার ছেলে রাসেল বলতে পারবে। এসময় রাসেল বাড়িতে ছিল না। লেখাপড়া বন্ধ করার বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদ আরো বলেন, লেখাপড়া করে সংসারে সময় দেওয়া সম্ভব হয়না।ছেলেও চাইছিল না সেতু লেখাপড়া করুক। তাই আমি সেতুকে লেখাপড়া বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বুঝিয়ে বলেছিলাম।

সল্লাবাদ ইউনিয়নের সহকারী কাজী মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে মারধরের মামলা করার বিষয়ে বাদী ফরিদ মিয়া বলেন, কাজী নাকি সম্পর্কে সেতুর মামা হয়। আমার ছেলে কাবিনের কাগজ চাইলে সে ডিভোর্স না দেওয়ার জন্য আমার ছেলেকে ধমক দিয়েছিল। তাছাড়া বিয়ের সময় দেওয়া গয়না কাবিনে উল্লেখ করা হয়নি তাই কাজীর বিরুদ্ধে মামলা করেছি। তবে রেকর্ড না করার শর্তে তিনি এটা স্বীকার করেন যে কাজী আসলে তাকে কোনো ধরনের মারধর করেনি। মামলা সাজানোর জন্য এই মিথ্যা কথা লিখা হয়েছে।

সহকারী কাজী মেহেদী হাসান বলেন, ডিভোর্স না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম বলে আমাকে মিথ্যা মামলায় আসামী করা হয়েছে। আমি এর ন্যায় বিচার চাই। প্রয়োজনে আমিও মানহানি মামলা করব।

রেজাউল/বার্তাবাজার/এম আই

Leave a Reply

Your email address will not be published.