October 6, 2022

প্রায় অর্ধেক দামে কিনে নেয়া হয় অটোরিকশা ও চার্জার ভ্যানের পুরাতন ব্যাটারি। এরপর পুরাতন ব্যাটারিতে থাকা বিভিন্ন পার্টস খুলে বিভিন্ন প্রক্রিয়া করার পর পুনরায় নতুন ব্যাটারিতে ব্যবহার করা হয়। পুরাতন ব্যাটারি থেকে বিষাক্ত এ্যাসিডের সীসা পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা হয়। এসব ব্যাটারি থেকে বের করা বিষাক্ত এ্যাসিড ও আগুনে পোড়ানো বিভিন্ন পর্দাথের কুন্ডলী থেকে বের হওয়া সিসায় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কারখানার পাশের ফসলী জমি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের বাবু ডাইং-কেন্দুল রাস্তার ধারে ফসলী জমিতেই গড়ে উঠেছে পুরাতন ব্যাটারির কারখানা। পুরাতন ব্যাটারির বিষাক্ত এ্যাসিড ও ধোঁয়ায় পুড়ে ধ্বংস হচ্ছে আশেপাশের সরিষা, মসুরসহ বিভিন্ন ফসল। কোন অনুমোদন ছাড়াই ফসলী জমির মাঠে এমন স্পর্শকাতর পদার্থের কারখানা গড়ে তোলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তা বন্ধের দাবি স্থানীয় কৃষকদের।

স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকরা বলছেন, জনবসতিহীন এলাকা হওয়ায় নির্জনতার সুযোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যাটারি ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় এই কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের বিশ্বরোড মোড়ের মেসার্স আশরা অটো ও কাজল ব্যাটারি সার্ভিসিং সেন্টারের মালিক ব্যাটারি ব্যবসায়ী খুরশেদ আলম কাজল এই কারখানার মালিক। এছাড়াও গাইবান্ধার জাহাঙ্গীর ও মহসীন নামে আরও দুইজন মালিক রয়েছে কারখানাটির।

এক বছরের জন্য ১৮ কাঠা জমি ইজারা নিয়ে চারদিকে ত্রিপাল দিয়ে ঘিরে ফসলী জমিতেই গড়ে উঠেছে কারখানা। স্থানীয়রা জানায়, রাত গভীর হলেই পোড়ানো হয় পুরনো ব্যাটারির বিভিন্ন পদার্থ। আগুনে পুড়িয়ে পুরাতন ব্যাটারি থেকে ভিতরের সীসা বের করা হয়। পরে এসব পোড়া ব্যাটারির নির্গত সীসা ও অন্যান্য পদার্থ পুনরায় ব্যাটারি তৈরির কারখানায় বিক্রি করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতে যখন ব্যাটারি জ্বালানো হয়, তখন আশপাশের ৩ কিলোমিটার জুড়ে বিষাক্ত ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। এমনকি ইতোমধ্যে আশেপাশের ফসলী জমিতে এ্যাসিড ছড়িয়ে পড়ছে। জমির মালিক চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নামোশংকরবাটি গুমপাড়ার মিজান। গত ৩ মাস আগে মিজানের এই জমিতে পুরাতন ব্যাটারির কারখানা করা হয়েছে। এতে ফসলী জমির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির আশঙ্কা করছেন মৃত্তিকা বিজ্ঞানীরা।

কারখানার পাশেই ১২ বিঘা ফসলী জমি রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নিমগাছি সরকারপাড়া এলাকার মৃত আবু তালেবের ছেলে আতাউর রহমানের। তিনি বলেন, এটা স্থাপনের ফলে আমার সরিষা পুড়ে গেছে। এমনকি আশেপাশের সকল জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। ফসল নষ্ট হচ্ছে। তাদেরকে বলতে গেলে তারা বলছে, প্রশাসনকে ম্যানেজ করা আছে। তোমাদের যা ইচ্ছে করার করো।

সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের কেন্দুল গ্রামের কৃষক বইউদ্দিন জানান, রাতের বেলা পুরানো ব্যাটারিতে আগুন দেয়া হয়। সেসময় বিশাল কুন্ডলী তৈরি হয়। ব্যাপক গন্ধযুক্ত ধোঁয়ায় বিষাক্ত হয়ে উঠে বাতাস। শুনলাম তারা এক বছরের জন্য চুক্তি করে এই ফসলী জমি নিয়েছে। এসব কাজ করতে থাকলে এই এলাকার সকল ফসলী জমি নষ্ট হয়ে যাবে। দ্রুত এই কারখানা উচ্ছেদ করা প্রয়োজন।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে কৃষি জমিতে কোনধরনের কলকারখানা করা যাবে না। অথচ এখানে ব্যাটারির এ্যাসিড বের করা, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খোলা ও ব্যাটারি পোড়ানোর মতো কাজ করা হচ্ছে। নিজের ব্যবসায়ের স্বার্থে কৃষি জমি ও পরিবেশের ক্ষতি হলেও স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

জানা যায়, পুরাতন ব্যাটারির এই কারখানায় কাজ করা বেশিরভাগ লোক নওগাঁ, বগুড়া, গাইবান্ধার। তারা ব্যাটারির সকল যন্ত্রাংশ খুলে আলাদা করে ও ব্যাটারি পুড়িয়ে তা বগুড়ায় পাঠায়। সেখানে নতুন ব্যাটারিতে পুনরায় এসব যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়। শ্রমিকরা বলছেন, এখানে দৈনিক ১০০-১৫০টি ব্যাটারির যন্ত্রাংশ খোলা ও আগুনে পোড়ানো হয়। বুধবার (২৩ ফেব্রুয়ারী) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এ্যাসিডের কাজে কর্মরত শ্রমিকদের সর্তকতা নেই বললেই চলে। মুখে মাস্ক ছাড়াই কাজ করছেন শ্রমিকরা।

শ্রমিক আনোয়ার আলী জানান, পুরাতন ব্যাটারিগুলো খুলে যন্ত্রাংশগুলো আলাদা আলাদা করা হয়। রাতে ব্যাটারি পুড়িয়ে তা থেকে বিশেষ পদার্থ তৈরি করা হয়। এ্যাসিডের বিষয়ে তিনি বলেন, আশেপাশেই গর্ত করে এ্যাসিডগুলো রাখা হয়। তবে গড়িয়ে গড়িয়ে তা আশেপাশের জমিতেও যায়। কিন্তু এর তেমন কোন ক্ষতি হয়না।

জেলা শহরের বিশ্বরোড মোড়ে পুরাতন ব্যাটারি ক্রয় করেন সুমন আলী। বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আমরা ব্যাটারি ক্রয় করি। পরে সেগুলো ঢাকা, নওগাঁ, বগুড়াতে পাঠায়। তবে সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জেও এখন একটি কারখানা হয়েছে। সেখানেই পুরাতন ব্যাটারি খুলে প্রক্রিয়া করা হয়। এসময় আগুনের কুন্ডলীতে থাকা ধোঁয়ায় আমের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আমাকে বিভিন্ন জেলার কয়েকজন ব্যবসায়ী এই কারখানা করার প্রস্তাব দিলেও পরিবেশের কথা ভেবে তাতে রাজি হয়নি।

মেসার্স আশরা অটো ও কাজল ব্যাটারি সার্ভিসিং সেন্টারের মালিক ব্যাটারি ব্যবসায়ী খুরশেদ আলম কাজল এবিষয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি জানান, সারাদেশের সব জায়গায় এভাবেই পুরাতন ব্যাটারি প্রক্রিয়া করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমিই প্রথম এটা নিয়ে এসেছি। যখন কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছিল, তখন মাঠে ফসল ছিল না। তবে এখন কারো ক্ষয়ক্ষতি হলে, তার ক্ষতিপূরণ দিব। কারখানা স্থাপনের বিষয়ে কোন অনুমোদন বা লাইসেন্স নেই বলে জানান তিনি।

নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রভাষক ফাউজিয়া তাবাসসুম জানান, অটোরিকশার ব্যাটারিতে সালফিউরিক এ্যাসিডসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। ফসলী জমির পাশাপাশি মানবদেহে এসব এ্যাসিড মারাত্মক ক্ষতির কারন। এসব এ্যাসিডের প্রভাবে ক্যান্সার, কিডনীর বিভিন্ন সমস্যা, চর্মরোগসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এবিষয়ে রাজশাহী মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন বার্তা বাজারকে বলেন, ফসলী জমিতে যেকোন ধরনের এ্যাসিডের কারনে মাটির পিএইচ বেড়ে যায়। এতে মাটি অতিরিক্ত ক্ষারীয় হয়ে যায়। ফলে গাছপালা মাটি থেকে তার খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না৷ গাছের ফলন হয় না এবং গাছ বাড়েও না।

জেলা প্রশাসক একেএম গালিভ খান জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এমন কোন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেয়া হয়নি। তাছাড়া কৃষি জমির ক্ষতি করে এভাবে ব্যাটারির এ্যাসিডের কারখানা করতে দেয়ার প্রশ্নই আসেনা। এ বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলা হয়েছে।

সোবহান/বার্তাবাজার/এম আই

Leave a Reply

Your email address will not be published.